পদ থেকে বিদায়, আদর্শ থেকে নয়: আবেগঘন বার্তায় নাছির উদ্দিন নাছির
রাজনীতির পথ কখনো মসৃণ হয় না। কখনো সেখানে থাকে রাজপথের উত্তাপ, কখনো অনিশ্চয়তা, কখনো ত্যাগ আর কখনো সহযোদ্ধাদের ভালোবাসায় ভেজা অসংখ্য স্মৃতি। দীর্ঘ সতেরো বছরের রাজনৈতিক পথচলা শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ দিনে সেই স্মৃতির দরজাই যেন খুলে দিলেন নাছির উদ্দিন নাছির।
সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী বার্তায় নাছির ফিরে দেখেছেন তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত দীর্ঘ পথ। স্মরণ করেছেন আন্দোলন-সংগ্রামে হারিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের, কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সহযোদ্ধাদের প্রতি, তুলে ধরেছেন অর্জন ও অপূর্ণতার কথা। আর সবকিছুর শেষে জানিয়েছেন- পদ থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে নয়, আদর্শ ও ভালোবাসা থেকে নয়।
তার বিদায়ী বার্তার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে যেন মিশে আছে একজন সংগঠকের দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি, প্রাপ্তির আনন্দ, কিছু অপূর্ণতার আক্ষেপ আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
‘এই পথচলা সহজ ছিল না’
ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সূচনার কথা স্মরণ করে নাছির লিখেছেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের সীমাহীন অনিশ্চয়তা পেরিয়ে তারা আজ ভিন্ন এক বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
তার ভাষায়, এই পথচলায় ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতা। সেই কঠিন সময়ে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন তিনি।
নাছিরের কাছে তাদের ত্যাগ শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়; বরং আজকের অবস্থানের ভিত্তি গড়ে দেওয়া এক দীর্ঘ আত্মত্যাগের ইতিহাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির উদ্দিন নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তখন হয়তো তার কল্পনাতেও ছিল না, একদিন সেই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব তার কাঁধে উঠবে।
কিন্তু সময় তাকে নিয়ে গেছে সেই পথেই।
বিদায়ী বার্তায় তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি শুধু পদ-পদবির হিসাব নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সংকটে সহযোদ্ধার হাত ধরা এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকাই রাজনীতির প্রকৃত অর্থ।
আর সেই দীর্ঘ যাত্রায় ছাত্রদল তাকে দিয়েছে পরিচয়, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পথচলার সুযোগ- যেগুলোকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।
জুলাই-আগস্ট: সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়
২০২৪ সালের ১ মার্চ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলার কথা উল্লেখ করেছেন নাছির। তবে তার ভাষায়, সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট।
উত্তাল সেই সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তার দাবি, সেই সময়ে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকাও বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন তিনি।
তবে ইতিহাসের পাতায় হয়তো তাদের সবার নাম লেখা থাকবে না। কিন্তু নাছিরের উপলব্ধি- কোনো গণআন্দোলনের ইতিহাস কেবল কয়েকজনের নাম দিয়ে লেখা যায় না; এর নেপথ্যে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক তরুণের ত্যাগ।
যাদের সঙ্গে রাজপথ ভাগ করে নিয়েছিলেন
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও স্মরণ করেছেন নাছির।
তার ভাষায়, আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের অবস্থান বা বক্তব্যে হয়তো ছাত্রদলের অবদান সবসময় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি- তবু সেই সময়ের সহযোগিতার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
কারণ, তার কাছে সংকটের সময়ে পাশাপাশি দাঁড়ানোর মূল্য রাজনীতির তাৎক্ষণিক হিসাবের চেয়ে অনেক বড়।
বন্যার্ত মানুষের পাশে ছুটে যাওয়ার স্মৃতি
বিদায়ী বার্তার সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলোর একটি নোয়াখালী-ফেনীর বন্যার স্মৃতি।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পরপরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে নিজের এলাকার সন্তান হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ পেয়েছিলেন নাছির।
তিনি স্মরণ করেছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে তারেক রহমানও ফোন করে দ্রুত ফেনীতে যাওয়ার কথা জানান।
নেতৃত্বের নির্দেশ পাওয়ার পর রাতেই ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন নাছির। দুই দিন পর অন্য নেতারাও সেখানে ছুটে যান।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে নাছিরের উপলব্ধি- রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের নাম নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
দেশনেত্রীর সেই নির্দেশকে তিনি শুধু একজন নেত্রীর আদেশ হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক আহ্বান হিসেবে।
দুই হাজারের বেশি কমিটি, তবু রয়ে গেছে আক্ষেপ
দায়িত্ব পালনকালে প্রায় দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন নাছির। এটিকে নিজের একক অর্জন হিসেবে দেখেননি তিনি। বরং বলেছেন, এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।
তবে সবকিছু সম্পূর্ণ করতে না পারার আক্ষেপও রয়েছে তার।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পদ পাননি, তাদের প্রতিও জানিয়েছেন সহমর্মিতা।
নাছিরের উপলব্ধি- একটি পদ কখনো কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। আজ যারা দায়িত্ব পাননি, আগামী দিনে তাদের অনেকেই আরও বড় নেতৃত্বে আসবেন- এমন আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফল, যে আক্ষেপ থেকে গেল
নাছিরের বিদায়ী বার্তায় আত্মসমালোচনার জায়গাটিও বেশ স্পষ্ট।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়াকে নিজের জন্য ভাবনার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। কোথায় ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা যেত- সেসব প্রশ্ন নিজের কাছেই করেছেন।
তবে পরাজয়কে তিনি শেষ হিসেবে দেখছেন না। বরং রাজনীতির পরাজয় থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন।
তার বিশ্বাস, এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ছাত্রদল ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত ছাত্রসংগঠনে পরিণত হবে।
‘ছাত্রদল থেকে নয়, পদ থেকে বিদায়’
বিদায়ী বার্তার সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ যেন জমা হয়েছে এই কথাগুলোতে-
‘আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।’
এই একটি বাক্যেই যেন নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন নাছির।
নতুন নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখার কথা জানিয়ে বলেছেন, তাদের প্রয়োজন হলে, তাদের ডাকে আগের মতোই পাশে থাকবেন।
অর্থাৎ দায়িত্বের চেয়ার বদলালেও সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কোনো ইতি টানছেন না তিনি।
ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন সহযোদ্ধাদের কাছে
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথে ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক- এ কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন নাছির।
কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
পরিবারের প্রতিও জানিয়েছেন গভীর কৃতজ্ঞতা। রাজনৈতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যস্ততা, অনুপস্থিতি ও কঠিন সময়গুলো নীরবে সহ্য করার জন্য পরিবারের সদস্যদের স্মরণ করেছেন আবেগ নিয়ে।
কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বন্ধু ও সাংবাদিকদের প্রতিও। প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাকেও প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখেছেন তিনি।
‘দেখা হবে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে’
শেষদিকে এসে বিদায়ের ভাষাও যেন আরও নরম হয়ে এসেছে।
নাছির লিখেছেন, তিনি একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু সম্পর্ক, সংগ্রাম কিংবা আদর্শ থেকে নয়। হয়তো অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে, অন্য কোনো সময়ে আবার দেখা হবে।
এই বিদায় তাই চূড়ান্ত বিদায় নয়- বরং একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, আরেকটি অধ্যায়ের অপেক্ষা।
শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নও ব্যক্তিগত নয়। তিনি এমন একটি সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখতে চান, যেখানে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। তার প্রাণের সংগঠন ছাত্রদলও সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে অবিচল থাকবে- এমন প্রত্যাশা তার।
বিদায়ী বার্তার শেষ শব্দগুলো তাই যেন একজন নেতার নয়, একজন দীর্ঘদিনের পথিকের কণ্ঠস্বর-
‘ছাত্রদলের প্রতিটি সহযোদ্ধার আগামী সুন্দর হোক। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক।’


আপনার মতামত লিখুন
Array