ভোট না-কি ভূততত্ত্ব!
অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা—এমন ২৬টি দেশে ভোট দেয়া কেবল নাগরিক অধিকার নয়, বরং সাংবিধানিক অথবা আইনগত বাধ্যতামূলক। বলিভিয়ায় কেউ ভোট না দিলে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ৩ মাস কোনও টাকা তুলতে পারবে না। আর অস্ট্রেলিয়ায় কেউ যদি ভোট না দেয়, তবে তাঁকে গুনতে হয় ২০ ডলার জরিমানা! আমরা বাংলাদেশে যেখানে ছোটবেলায় পড়ে এসেছিলাম ভোট দেয়া সুনাগরিকের গুণাবলি’। এ ছাড়া উল্টো কত পথ, কত মাধ্যমে দেখেছি মানুষ যেন ভোট না দিতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনাপ্রতিদন্ধিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর, এমপি-মন্ত্রীসহ তৎকালীন আমলা-সচিবরা গোটা নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। সব সেক্টরে দুর্নীতি ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দুনীর্তিগ্রস্ত একটা সিস্টেমই প্রতিষ্ঠাকরণের চেষ্টা করেছিল। কারণ, সেই সংসদ সদস্য হবার জন্য জনগণের ভোটেরই দরকার হয়নি তাদের! তাই অনেকে কর্তৃত্ববাদী বা স্বেচ্ছাচারী আধিপত্য বহাল রেখে চলেছিল এবং নিজেদের জোট থেকেই আরেকটি পক্ষকে বিরোধীদল বানিয়ে ‘সংসদ’কে বৈধতা দেয়া হয়, যা ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক ও লজ্জাকর অধ্যায়।
ভোট দিতে যেমন পলিটিক্যাল পার্টি বাধা দিয়েছিল, অপরপক্ষে কিছুকিছু সরকারি কর্মকর্তা, যাদের হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার ন্যস্ত থাকে, তারাই গণনায় ইচ্ছামতো প্যাঁচ সৃষ্টি করে এই ভোট ব্যবস্থাকে ভূত-ব্যবস্থা করে ফেলেছিল, যেখানে মৃতব্যক্তিও এসে ভোট দিয়ে আবার কবরে ঢুকে গিয়েছিলেন! আবার স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পরাধীন নির্বাচন কমিশন হিসেবে নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করেছে, প্রায় ৫ লাখ ভোটার আছে যারা পায়ের ছাপ দিয়ে ভোটার হয়েছে! এটাও আমাদের দেখতে হয়েছে।
যদি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে ভোট কাস্টিং ৮০ শতাংশের বেশির বিকল্প নাই। এমনকি আমাদের দেশের শিক্ষকগণ সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অর্থ-লোভ বা প্রাণ ভয়েই হোক—নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্দ্বিধায় অন্যায়কে বৈধতা দিয়েছেন।
তাই রাষ্ট্র যদি সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আর তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতার পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের আশপাশ এলাকার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে। অন্যথায় সংবিধান সংস্কার কমিশন, ঐকমত্য কমিশন—যেভাবেই স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের কথা বলুক না কেন, কোনও লাভ নেই। কারণ কেন্দ্রে যদি জনগণের উৎসবমুখর অংশগ্রহণ না থাকে, ভোট কাস্টিং যদি ৬০-৮০ শতাংশ না হয়, তাহলে সঠিক মতামত উঠে আসবে না।
দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে বিষয়গুলো ঘটে থাকে, তার মধ্যে কিছু বলি—‘নিজের টাকা খরচ কইরা ভোট দিমু না’, ‘বাইরে গন্ডগোল হবে, কেন্দ্রে যাবার দরকার নাই’, ‘আমার একটা ভোট না দিলে কী হবে’, ‘একটা লাইনে এতক্ষণ দাঁড়াতে পাড়বো না’, ‘হেঁটে হেঁটে ভোট কেন্দ্রে যাব না’, ‘ভোট দিলেই কী, আর না দিলেই কী! অমুক তো এমনিতেই পাস’, ‘শুধু একটা ভোট দেয়ার জন্য ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকায় যাব?’, ‘না থাক সামনের মাসে আর্থিক সমস্যা হবে’… ইত্যাদি ইত্যাদি নানান রকম ইস্যু সৃষ্টি করে অনেকে ভোট দিতে যান না।
ভোট ব্যবস্থাকে নানাভাবে এই ভূত ব্যবস্থা বানানোর অন্যতম কারিগর কিছু অসাধু কর্মকর্তা, যারা নিজেদের প্রমোশন ঠিক রাখতে যেয়ে পুরো সিস্টেমকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের দেশে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’কে অনেকে ভোটার আইডি মনে করেন। আমরাও যদি তা ধরে নিই, তবে রোহিঙ্গা নেতা মৃত মুহিবুল্লাহ কীভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র পান, এবং পাসপোর্ট বানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে যেয়ে দেখাও করে আসেন বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে!
মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেয়ে ভোট দিবে কেন? যখন সবসময়ই একটা অস্থিরতা কাজ করবে, তখন তাঁরা এমনিতেই ভোট দিতে ভয় পাবেন; এটাই স্বাভাবিক। অসম্ভব হলেও সত্যি ঢাকার প্রত্যেকটা আসনে ভোট কাস্ট হয় নামমাত্র! বিশেষ করে ঢাকা-১৭-তে ১১.৭৬% ভোট পেয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ এ আরাফাত মাত্র ২৮ হাজার ভোট পেয়ে এমপি হন, যেখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৫ হাজার ছিল।
গুলশান, বনানী, নিকেতন, বারিধারা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, করাইল, ভাসানটেকের মধ্যে গুলশান, বারিধারা, বনানীকে যদি এলিট ক্লাস বিবেচনা করি, তবে তাঁদেরই আগে ভোটকেন্দ্রে যাবার কথা। কিন্তু উল্টো তাঁরাই অনুপস্থিত বেশি থাকেন। সেই ক্ষেত্রে ‘ভূত ব্যবস্থা’কে নাগরিকের ভোট ব্যবস্থায় পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যেমন ভোটের ডেটা যদি ব্যাংকের সাথে সিনক্রোনাইজ থাকে, তবে যে ভোট দিবেন না, তাঁকে ব্যাংক হতে পরবর্তী ৩ মাসের জন্য টাকা তুলতে দেয়া আদালত কর্তৃক নিষেধ থাকবে। তবে নির্বাচনের দিন তাঁদের বিশেষ সার্ভিসে গাড়ি ব্যবহার করতে দিতে হবে। এছাড়া বিরক্তিকর যেন না হয়, সেজন্য বুথ বাড়াতে হবে। যাঁরা ভোট দিবেন না, তাঁদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি, তাঁর নিজের ঋণ গ্রহণ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
যদি কোনও রাজনৈতিক দলের একজন নেতাকর্মীও ভোট প্রদানে বাধা প্রদান করে, তবে শাস্তিস্বরূপ তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ৬ মাস অথবা ১ বছরের জন্য সরকারের নিকট জমা থাকবে, যেন তিনি কোনোরকম কার্যক্রম চালাতে না পারেন। আর মফস্বল অঞ্চলে নারী ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য, যদি কোনও নারী ভোটার কেন্দ্রে না আসেন, তবে তাঁর সন্তানের স্কুলে ১ মাসের জন্য সকল প্রকার উপস্থিতি বন্ধ থাকার নিয়ম হলে, আশা করা যায় ভোট প্রদান বাড়তে পারে।
চলুন দেশের মানুষ
সবাই হই জোট
মিলেমিশে দেব ভোট
ভূতব্যবস্থা থেকে
ভোটব্যবস্থা ফিরে আসুক তবেই গণতান্ত্রিক শক্তি রক্ষা পাবে, পাবে পূর্ণতা। ফ্যাসিজম শেষ, গণতন্ত্র আসছে। আর এটা সাধারণ জনগণ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক: কৃষিবিদ আরাফাত আদনান লিপু, রাজনৈতিক বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন
Array