ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি: শীর্ষ পদে আলোচনার কেন্দ্রে মিল্টন-জাহাঙ্গীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:১৭ অপরাহ্ণ

ঢাকা: ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। সভাপতি বা আহ্বায়ক এবং সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় অভিজ্ঞ ও পরিচিত কয়েকজন নেতার নাম উঠে এলেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর।

দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় মিল্টনকে সভাপতি বা আহ্বায়ক এবং এসএম জাহাঙ্গীরকে সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি দলীয় একটি সূত্রের দাবি, এই দুই নেতাকে নিয়ে নেতৃত্বের সমীকরণ অনেকটাই এগিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না আসায় বিষয়টি এখনো সম্ভাবনার মধ্যেই রয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ কাটিয়ে মহানগর উত্তর বিএনপিকে সক্রিয় করতে সক্ষম নেতৃত্ব বেছে নেওয়াই হবে নতুন কমিটির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

সভাপতি পদে আলোচনার কেন্দ্রে মিল্টন

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির শীর্ষ পদে সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নাম। মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি তিনি।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিল্টন। দায়িত্ব নেওয়ার পর নগর পরিচ্ছন্নতা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং নাগরিক সেবা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকার কারণে আলোচনায় এসেছেন তিনি। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, আগামী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের সম্ভাব্য হিসাবেও মিল্টনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মহানগর উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নগর প্রশাসক হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণ- সব মিলিয়ে মিল্টনকে ঘিরে আলোচনা তৈরি হলেও সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে তাঁর নিয়োগ এখনো নিশ্চিত নয়।

আলোচনায় নীরব, আমিনুল ও মামুন হাসান

সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক দুঃসময়ে ভূমিকার কারণে নতুন কমিটি ঘিরে তাঁর নাম আবারও আলোচনায় এসেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন নীরব। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনার কারণে তাঁকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন কমিটিতে তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে।

এ ছাড়া সদ্য সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের নামও সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছে। মহানগর উত্তর বিএনপির নেতৃত্বে আবারও ফেরার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ রয়েছে বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

একই পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান। যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতার তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে সভাপতি পদে তাঁর নামও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সেগুন ও আঞ্জুর নামও আলোচনায়

সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রনেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার কারণে নেতৃত্বের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছেন তিনি। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততাও তাঁর পক্ষে বিবেচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এ ছাড়া বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুন্সি বজলুল বাছিত আঞ্জুর নামও সভাপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে একাধিক নেতার নাম সামনে এলেও কার পক্ষে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত আসে, তা নির্ভর করছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক সমীকরণের ওপর।

সাধারণ সম্পাদক পদে এগিয়ে এসএম জাহাঙ্গীর?

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এসএম জাহাঙ্গীর, সাবেক কমিশনার আনারুজ্জামান আনোয়ার, সাবেক সদস্যসচিব হাজী মোস্তফা জামান, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী ইউসুফ এবং সাবেক দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক।

তবে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে এসএম জাহাঙ্গীরের নামই তুলনামূলকভাবে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। মহানগর উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং সংসদ সদস্য হিসেবে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নতুন কমিটিতে তাঁর দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

দলীয় একটি সূত্রের দাবি, সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে মিল্টন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে এসএম জাহাঙ্গীরকে নিয়ে নেতৃত্বের একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

কমিটি বিলুপ্তির পর নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত আসে।

কমিটি বিলুপ্তির পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন কমিটিতে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাঁরা একদিকে সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলা করতে পারবেন, অন্যদিকে তৃণমূলের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।

এ ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক জ্যেষ্ঠতা নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে মহানগর উত্তর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার বিষয়টিও নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে শীর্ষ পদ?

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি ঘিরে সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনা এখন তুঙ্গে। সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে মিল্টন, নীরব, আমিনুল হক, মামুন হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ও মুন্সি বজলুল বাছিত আঞ্জুর নাম আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে এসএম জাহাঙ্গীরকে ঘিরে আগ্রহ তুলনামূলক বেশি।

তবে আলোচনায় এগিয়ে থাকা আর দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এক বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচন।

এখন দেখার বিষয়, নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে, নাকি সাংগঠনিক পুনর্গঠনের স্বার্থে নতুন সমীকরণ সামনে আসবে। বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত মিল্টন-জাহাঙ্গীরের সম্ভাব্য নেতৃত্বসহ আলোচনায় থাকা সব নামই থাকছে অনুমান ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পর্যায়ে।

প্রিন্ট করুন