সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নৈতিকতা ও জনগণের আস্থা: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:২৫ অপরাহ্ণ

সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার মধ্যেই একটি বাহিনীর মূল শক্তি নিহিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিক সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকবেন, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে না। বরং শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থা একটি বাহিনীর প্রকৃত শক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাসদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। স্বাধীনতার জন্য তাদের সেই প্রতিরোধ বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে নিরাপত্তা পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন ও কৌশল। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। তাই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে জাতীয় প্রয়োজনে তিন বাহিনী একযোগে দায়িত্ব পালন করতে পারে। দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করার ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী দায়িত্বের বিষয়টি উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সেনাসদস্যদের কল্যাণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জাতীয় পে স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যে ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থেকে ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা প্রদান করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা অর্জনকারী সাতটি ইউনিটকে এই গৌরবময় স্বীকৃতির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে একটি আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকা অর্জনকারী ইউনিটগুলোকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালনের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কোনো ইউনিটের জন্য জাতীয় পতাকা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়, বরং এটি সেই ইউনিটের গৌরবময় ঐতিহ্য, বীরত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। লাল-সবুজের এই পতাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অসংখ্য বীরের আত্মত্যাগের ইতিহাস। জাতীয় পতাকা প্রদানের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের আস্থা, স্বীকৃতি ও সম্মানের প্রতিফলন ঘটে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিভিন্ন পর্যায়ের সেনাসদস্য এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

প্রিন্ট করুন