রাজপথের আন্দোলন, ক্যাম্পাসের উত্তাপ, সাংগঠনিক ব্যস্ততা আর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। নতুন কমিটি গঠনের আগে আবেগঘন এক বিদায়ী বার্তায় নিজের দীর্ঘ দায়িত্বকাল, সহযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
বিদায়ী বার্তাটি যেন কেবল একটি সাংগঠনিক দায়িত্বের সমাপ্তির কথা নয়; বরং জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পর্দা নামার মুহূর্তে ফিরে তাকানো এক মানুষের আত্মকথন। যেখানে আছে কৃতজ্ঞতা, গর্ব, আত্মসমালোচনা, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং নতুন করে নিজেকে গড়ার প্রত্যয়।
বার্তার শুরুতেই মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাকিবুল ইসলাম রাকিব লিখেছেন, ‘মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট লাখো কোটি শোকরিয়া, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’
দীর্ঘ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের প্রতিও জানিয়েছেন অশেষ কৃতজ্ঞতা।
নিজের নেতৃত্বকালীন সহযোদ্ধাদের কথা বলতে গিয়ে আবেগ আরও গভীর হয়েছে রাকিবের। কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন তিনি। বিশেষভাবে ঢাকা মহানগরের পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, তাদের শ্রম-ঘামেই রাজপথের কর্মসূচিগুলো সফল হয়েছে এবং নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।
সহযোদ্ধাদের নিয়ে নিজের গর্বের জায়গাটিও স্পষ্ট করেছেন ছাত্রদল সভাপতি। তার ভাষায়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাদের নামে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খবরের শিরোনাম হয়নি—এটিই তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় অর্জন।
আর্থিক সংকটের মধ্যেও নেতাকর্মীরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ ইউনিট পরিচালনা করেছেন উল্লেখ করে রাকিব লিখেছেন, তারা শুধু নিজেরাই সৎ ও পরিশ্রমী ছিলেন না, বরং অধীনস্থ নেতাকর্মীদেরও নীতি ও আদর্শ নিয়ে চলার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।
‘একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার না হন’
রাকিবের বিদায়ী বার্তায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গও। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল- ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মীর কারণে যেন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
এমনকি নিজের দলের বাইরের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তার কাছে এলে নিজের অবস্থান থেকে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাজনীতির পরিচয়ের বাইরে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটি ধরে রাখার এই বার্তা তার বিদায়ী বক্তব্যকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিও উঠে এলো
রাকিব-নাসির কমিটির অন্যতম সাফল্য হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন এবং রাজপথে কার্যকর ভূমিকা পালনের কথা উল্লেখ করেছেন রাকিব।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী বাস্তবতায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শত শত মব মোকাবিলা করতে হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক বুলিং উপেক্ষা করেও নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।
তার বিদায়ী বার্তায় তাই শুধু অর্জনের গল্প নেই; আছে কঠিন সময়ের স্মৃতিও। আছে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রতিকূলতার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সংগঠনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার দিনগুলোর ছায়া।
‘একটা নতুন জীবন শুরু করতে চাই’
সবশেষে এসে যেন রাজনীতির কোলাহল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়েছেন রাকিব। দীর্ঘ দায়িত্ব শেষে নতুনভাবে জীবন শুরু করার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন তিনি।
লিখেছেন, ‘একটা নতুন জীবন শুরু করতে চাই। নিজেকে আরও বেশি পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়তে চাই।’
নিজের ভুল-ত্রুটির কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ সময়ে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
বিদায়ের এই মুহূর্তে তাই রাকিবের কণ্ঠে নেই কেবল নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ; বরং আছে একজন মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা। যে পথ পেরিয়ে এসেছেন, সেখানে যেমন আছে সংগ্রামের গর্ব, তেমনি আছে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিনয়।
নতুন কমিটিকে সাদরে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে নিজের বার্তার ইতি টেনেছেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
একটি অধ্যায়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তার বিদায়ী বার্তা যেন বলে- রাজনীতির মঞ্চে আলো বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়, মুখ বদলায়; কিন্তু ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি আর সহযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসা থেকে যায়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ । ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ